
ক্যান্সার চিকিৎসা এখন আর অনুমাননির্ভর নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘প্রিসিশন অনকোলজি’ একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা, যেখানে রোগীর টিউমারের জেনেটিক ও মলিকুলার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করা হয় কোন চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর হবে এবং কোনটি অপ্রয়োজনীয়। এই নির্ভুল চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো মলিকুলার ডায়াগনোসিস। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ সেবার পর্যাপ্ত ও সংগঠিত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বর্তমানে EGFR, ALK, ROS1, BRAF, HER2, BRCA, NTRK কিংবা PD-L1–এর মতো মলিকুলার পরীক্ষাগুলো বহু ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা সিদ্ধান্তে অত্যন্ত জরুরি। এসব পরীক্ষা ছাড়া টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি দেওয়া কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে পর্যাপ্ত মলিকুলার পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারা পরীক্ষার জন্য নমুনা বিদেশে যেমন- ভারত, সিঙ্গাপুর কিংবা ইউরোপে পাঠাচ্ছে। এতে একদিকে রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হয়, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তারা আধুনিক ও গাইডলাইনভিত্তিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতার পরিবর্তন সম্ভব একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে। সরকারি তত্ত্বাবধানে দেশে মানসম্মত মলিকুলার ল্যাব স্থাপনই হতে পারে এর কার্যকর সমাধান। এককভাবে সরকারের পক্ষে এটি বাস্তবায়ন কঠিন হলেও সরকার–বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেলে, বিশেষ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা পুরোপুরি সম্ভব।
বর্তমানে বাংলাদেশে একাধিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ক্যান্সারের আধুনিক ওষুধ, টার্গেটেড থেরাপি ও বায়োসিমিলার উৎপাদন করছে। কিন্তু উপযুক্ত মলিকুলার পরীক্ষা ছাড়া এসব ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না। যদি দেশে এই পরীক্ষাগুলো সহজলভ্য হয়, তবে চিকিৎসা হবে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণকারী। এতে রোগী উপকৃত হবেন, চিকিৎসক আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং ফার্মা শিল্পের টেকসই বিকাশও ঘটবে—যা নিঃসন্দেহে একটি উইন–উইন পরিস্থিতি।
সরকার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার নির্বাচিত ফার্মা কোম্পানিকে ল্যাব স্থাপনের জন্য জায়গা, কর সুবিধা, দ্রুত রেগুলেটরি অনুমোদন ইত্যাদি সহায়তা দিতে পারে। বিনিময়ে মলিকুলার পরীক্ষার মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারে । পাশাপাশি, এসব ল্যাবে দ্বৈত মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি—সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি স্বাধীন একাডেমিক বা পেশাদার বডির মাধ্যমে নিয়মিত অডিট ও কোয়ালিটি চেকের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এই উদ্যোগে দেশে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত মানসম্মত ডায়াগনস্টিক ল্যাবগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব ল্যাব ইতোমধ্যে হিস্টোপ্যাথলজি, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি ও বেসিক জেনেটিক টেস্টে অভিজ্ঞ, তাদের সরকারি নীতিমালার আওতায় ধাপে ধাপে মলিকুলার টেস্টিংয়ের জন্য উন্নীত করে একটি জাতীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত করা গেলে দ্রুত ও বিস্তৃত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এক্ষেত্রে কঠোর ও স্বচ্ছ মাননিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত জনবল, মানসম্মত SOP (Standard of Practice) এবং এক্সটার্নাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স অপরিহার্য।
ক্যান্সার কেবল একটি রোগ নয়; এটি একটি পরিবারকে আর্থিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভেঙে ফেলে । যখন রোগী জানতে পারেন যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেশে নেই বা রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে, তখন তার অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই বিলম্বই রোগকে আরও জটিল করে তোলে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে এই কষ্ট অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার চিকিৎসা দ্রুত মলিকুলার-নির্ভর হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক গাইডলাইনগুলোতে নির্দিষ্ট মিউটেশন ছাড়া অনেক ওষুধ ব্যবহারের সুপারিশই আর নেই। ফলে মলিকুলার ল্যাব ছাড়া বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বৈশ্বিক মান থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, দেশে এই ল্যাবগুলো স্থাপিত হলে প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, গবেষণার সুযোগ বাড়বে এবং বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ডায়াগনস্টিক হাব হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
সবশেষে বলা যায়, এটি কেবল স্বাস্থ্যখাতের একটি দাবি নয়; এটি একটি জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডা। সরকার, ফার্মা শিল্প, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চিকিৎসক সমাজ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে যদি দেশে মানসম্মত, সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ মলিকুলার ডায়াগনস্টিক অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তবে হাজারো মানুষ বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা পাবে নিজের দেশেই। এখনই সময় সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
লেখক: ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
সিনিয়র কনসালট্যান্ট– এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা
jugantor













