পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্য গ্রহগুলোর তুলনায় সূর্য দানবীয় আকৃতির। প্রায় ১.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার চওড়া এই নক্ষত্র পৃথিবীর চেয়ে ১০০ গুণেরও বেশি বড়। তবে মহাকাশ বিজ্ঞানের ভাষায় সূর্যকে প্রায়ই ‘ডোয়ার্ফ’ বা ‘বামন নক্ষত্র’ বলে সম্বোধন করা হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত বিশাল হওয়ার পরও সূর্য কি সত্যি বামন?
মহাকাশ গবেষকদের মতে, কারিগরি ভাষায় সূর্য একটি ‘জি-টাইপ মেইন-সিকুয়েন্স স্টার’ বা সংক্ষেপে ‘জিটুভি’ নক্ষত্র। এখানে ‘ভি’ অক্ষরটি নির্দেশ করে যে এটি একটি বামন নক্ষত্র। ড্যানিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এজনা হার্টজস্প্রাং প্রথম এই নামকরণের প্রথা চালু করেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, লাল রঙের নক্ষত্রগুলো হয় খুব উজ্জ্বল নয়তো খুব ম্লান হয়। তিনি উজ্জ্বলগুলোকে ‘দানব’ (জায়ান্ট) ও ম্লানগুলোকে ‘বামন’ (ডোয়ার্ফ) নামে অভিহিত করেন।
সূর্য যেহেতু বিশালাকার লাল দানব নক্ষত্রগুলোর চেয়ে আকারে অনেক ছোট, তাই একে বামন নক্ষত্রের শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘জি’ বর্ণটি হলুদ রঙের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ৫ হাজার ১২৫ থেকে ৫ হাজার ৭২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সম্পন্ন নক্ষত্রগুলো এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ৫২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে মজার বিষয় সূর্যকে হলুদ বলা হলেও এর প্রকৃত রং সাদা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আলোর বিচ্ছুরণের কারণে আমরা একে হলুদ দেখি। সূর্যের মূল আলোতে সব দৃশ্যমান রঙের অস্তিত্ব রয়েছে।
সূর্য বর্তমানে তার জীবনের ‘মেইন সিকুয়েন্স’ বা প্রধান পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়ে নক্ষত্রগুলো নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তরিত করে প্রচণ্ড শক্তি উৎপন্ন করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যের চেয়ে কম ভরের নক্ষত্রগুলো দেখতে কমলা বা লাল হয়। আর সূর্যের চেয়ে বেশি ভরের নক্ষত্রগুলো হয় নীল রঙের। সূর্য এই তালিকার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকলেও এটি বামন নক্ষত্রের কাতারে পড়ে।
তবে সূর্য চিরকাল এমন থাকবে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আকারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত কয়েক শ কোটি বছরে এটি প্রায় ১০ শতাংশ বড় হয়েছে। আগামী ৫০০ কোটি বছর পর যখন সূর্যের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে, তখন এটি ফুলতে শুরু করবে এবং একটি ‘লাল দানব’ বা ‘রেড জায়ান্ট’-এ পরিণত হবে। তখন সূর্য আর বামন থাকবে না। সেই বিশালাকার সূর্য শুক্র গ্রহ এবং সম্ভবত পৃথিবীকেও গিলে ফেলবে। তখন এর তাপমাত্রা কমে যাবে এবং রং হয়ে যাবে লাল। জীবনের সেই অন্তিম পর্যায়ের আগ পর্যন্ত মহাজাগতিক হিসেবে সূর্য একটি সগৌরবে টিকে থাকা ‘বামন’ নক্ষত্র।
/আবরার জাহিন
















